নিজস্ব সংবাদদাতা: আড়ে-বহরে ক্রমশ বাড়ছে শহর। নির্বিচারে গাছ কেটে তৈরি হচ্ছে বড়-বড় আবাসন ও শপিং মল। এই দৃশ্য শুধু কলকাতার নয়। দেশের সর্বত্র এই একই ছবি। রিয়েল এস্টেটের দাপটে অপরিকল্পিত ভাবে বেড়ে চলেছে বহুতল সব আবাসন । তাই আমরা আশপাশ নিয়ে কিছু ভাবছি না। এই গাছগুলো যাদের বাসস্থান ছিল, সকাল থেকে শুরু করে সারাদিন যারা খাবার সংগ্রহ করে দিনের শেষে কুলায় ফিরত, আজ তারা বাসস্থানচ্যুত।

হ্যাঁ, পাখিদের কথাই বলছি। বাসা বাঁধার জায়গা নষ্ট করেছি বলে আমাদের ওপর কি তাদের অভিমান হয়েছে? কারণ শহরে আজ আর শালিক-চড়ুইয়ের ঝগড়া দেখা যায় না। সারাদিন কিচিরমিচির পাখির আওয়াজ, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বিজ্ঞানের নানা গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, তাদের নাকি রাতে ঠিক মতো ঘুম হচ্ছে না। আশ্চর্যের বিষয় নয় কি? নিশ্চিন্তে না-ঘুমানোর বদভ্যাস তো ছিল একমাত্র আমাদের। ওদের হলটা কী? সন্ধে নামতে-না-নামতেই পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরে এসে, একটানা ঘুম দিত নিশ্চিন্তে। এটাই ছিল দস্তুর। ওদের চোখের ঘুম হরণ করল কে? এ প্রশ্ন করলে পক্ষীকুল নিশ্চিতভাবে আমাদের দিকেই আঙুল তুলে কারণগুলো জানাবে। তারা বলবে, আমাদের এই অত্যাধুনিক পরিবেশ, তাদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। মানে? মানেটা খুব সহজ। আজ কৃত্রিম আলোয় সাজিয়েছি আমরা শহর ও শহরাঞ্চল। দিনের মতোই উজ্জ্বল এখন রাতের বেলা। আলোয়-আলোয় মুড়ে দিয়েছি আমরা আমাদের প্রিয় শহরকে। আর এই রাতের অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর কারণে পাখিদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদিম অর্থাৎ স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি নষ্ট হচ্ছে। তাদের শরীর ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, কখন রাত হচ্ছে আর কখন দিন হচ্ছে। তাই তারা পারছে না, একটানা লম্বা সময় ধরে ঘুম দিতে।

অনেক সময়ে আবার, কোনও কোনও পাখির ঘুম ভেঙে যাচ্ছে অসময়ে, সূর্য ওঠার অনেক আগেই। এখন সারারাত শহর জাগে। আমরা জাগি। বাইরে খাওয়া-দাওয়া পার্টি হইহল্লা, সবকিছুর জন্য রাতটাকেই আমরা বেছে নিয়েছি। রাতের নিস্তব্ধতা কেড়ে নিয়েছে আমাদের গাড়ির আওয়াজ আর কোলাহল। এরও কুপ্রভাব পড়ছে পাখিদের ওপর। তাদের গভীর ঘুম ব্যহত হচ্ছে। তাদের আচরণেও আজ ক্লান্তি ও আলস্য দেখা যাচ্ছে। শব্দদূষণ ও আলোকদূষণের কারণে, তাদের পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না। সেই কারণে তাদের শরীর ভালো থাকছে না। আমরা কিন্ত সেইসব নিয়ে ভাবছি না। কারণ, নিজেদের জন্যই শুধু বাঁচব, এমন অঙ্গীকার করেছি যে আমরা! পাখিদের গান গাওয়া যে কমে গেছে, তা কি খেয়াল করেছি আমরা? অবশ্য পাখিদের গান এখন আর শুনবো কেন। নাগালের মধ্যেই তো আমরা পেয়ে যাচ্ছি ‘লাউড’ গান-বাজনা। পাখিদের চিকণমসৃণ গলার গান তার সঙ্গে পেরে উঠবে কী করে? দরকার পড়লে মুঠোফোনেই তো পেয়ে যাচ্ছি পাখপাখালির গান।

Translate »