নিজস্ব সংবাদদাতা: জগদীশচন্দ্র বসুর লেখায় আমরা পড়েছি, ‘নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? ‘মহাদেবের জটা হইতে’। আবহমান ভারত-আত্মার বহমান স্রোতে ভেসে চলেছে গঙ্গা। সেই উত্তরাখণ্ড থেকে তার উৎপত্তি। শেষ হচ্ছে বাংলায় এসে, সাগরে মিশছে যখন। প্রশ্ন হল, যে নদী ভারতের এতগুলো জনপদ পেরিয়ে বয়ে চলেছে, তার শরীর-স্বাস্থ্যের খবর কে নেবে? নদী তো আর সর্বংসহা নয়। উচ্চপ্রবাহ থেকে নিম্নপ্রবাহ তাকে বয়ে চলছে হচ্ছে। তরল বর্জ্য এসে মিশছে তার শরীরে। কঠিন বর্জ্য এসেও মিশছে তার শরীকে। কিন্তু, তার শরীর থেকে কি এই বর্জ্য নিষ্কাশিত হচ্ছে? এ-দেশে ধর্মীয় আচার-আচরণের কেন্দ্রে রয়েছে এই নদী। বাড়িতে পুজো হলে আগে থেকে গঙ্গার জল তুলে রাখতে হয়। আবার মোক্ষলাভের আশায় গঙ্গাতীরের মণিকর্ণিকা শশ্মানঘাটে দাহ করা হয় দেহ। সেই ছাই সোজা এসে গঙ্গায় মেশে। এছাড়াও, গঙ্গার বিস্তীর্ণ প্রবাহ পথে প্রচুর শবদেহ ভাসে। কারণ, দাহ করার সামর্থ্য না-থাকায় অনেক পরিবারই তাদের প্রিয়জনের মরদেহ গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। আবার, মরণকালে গঙ্গাতীরে রেখে মৃতপ্রায় পরিজনকে রেখে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। যা আজকের নয়, বহু বছরের।
দেখা যাচ্ছে, শুধু বারণসীর মণিকর্ণিকা ঘাটেই প্রতি বছর ৩২ হাজার দেহ দাহ হয়। কী বিপুল পরিমাণ চিতাভস্ম গঙ্গায় গিয়ে পড়ে তা অনুমান করা সহজ নয়। গঙ্গার অববাহিকা সংলগ্ন এলাকায় ৪৫ কোটি মানুষের বাস। তাই, কী পরিমাণ বর্জ্য এসে ওই এলাকায় মেশে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। ৫ বিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য গঙ্গায় গিয়ে মেশে, যার চারভাগের একভাগ মাত্র পরিশোধিত। দেখা যাচ্ছে, এইসব এলাকা সংলগ্ন গঙ্গায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ১৫০ গুণ বেশি মলবাহিত ব্যাকটেরিয়া রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, একদিকে ধর্মীয় আচার-আচরণ পালনের জন্য গঙ্গার জল যতটা পরিশুদ্ধ থাকার কথা ততটা পরিশুদ্ধ থাকছে না। অন্যদিকে, নাগরিক-বর্জ্যের একটা বড় অংশই পরিশুদ্ধ না-হয়ে সোজা গঙ্গায় পড়ছে। কোন পথে পরিত্রাণ, তা জানা নেই। এখনও। তাই শেষ অবধি প্রশ্ন রয়েই যায়, ‘কোথা হইতে আসিয়াছ’ ? আর উত্তর মেলে, ‘মহাদেবের জটা হইতে’। তবু, সেই নদীকে পরিশুদ্ধ রাখার জন্য আমাদের স্বার্থত্যাগ করতে পারি না আমরা।