নিজস্ব সংবাদদাতা: জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত ভাবনার মধ্যে সীমিত নেই। বিষয়টি এখন জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে ভাবনা তথা দুর্ভাবনা হয়ে উঠেছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী বর্ষাকাল, অতিবৃষ্টি আর অনাবৃষ্টি, আগের চেয়ে উষ্ণতর শীতকাল সামগ্রিকভাবে বাস্তুতন্ত্রকে এমনভাবে বদলে দিচ্ছে যা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সাথে সাথে, বংশ বিস্তারকারী জীবাণু— যেমন মশা, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক—তাদের মধ্যেও পরিবর্তন আসছে।
এর ফলে রোগের ধরনধারণের ক্রমশ পরিবর্তন আসছে। একসময় যে সব রোগ নির্দিষ্ট ঋতুর সাথে যুক্ত ছিল, সেগুলো আর সেইসব ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এই ধরনের অসুখবিসুখ এখন দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এমন সব জায়গায় এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে, আগে সেখানে তা দেখা দিত না। ডেঙ্গু থেকে শুরু করে ইনফ্লুয়েঞ্জা— জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধরন বা নিয়মগুলো বদলে যাচ্ছে। সংক্রামক রোগের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে বেশ ভালোই। যেমন তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশা দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারছে। দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারছে। অন্যদিকে, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘ সময় ধরে আর্দ্র আবহাওয়া তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের সাথে সাথে রোগ-জীবাণু বহনকারী প্রাণীরাও নতুন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিচ্ছে এবং তাদের বিস্তৃতির পরিধি বাড়াচ্ছে। সেই কারণেই রোগের প্রাদুর্ভাব এখন আর কেবল নির্দিষ্ট ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যেসব রোগ আগে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যেত, সেগুলো এখন আরও ঘন ঘন, আরও বিস্তৃত এলাকায়, দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যাচ্ছে।
এই ঘটনা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। একসময় নির্দিষ্ট সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদু্র্ভাব দেখা যেত। এখন আর তা দেখা যায় না। বর্ষা চলে গেলেও ডেঙ্গু রাজত্ব করছে। কেরলে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাত, মহারাষ্ট্রে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া, পাহাড়ি রাজ্যগুলোতে নতুন করে রোগের প্রাদুর্ভাব—সব মিলিয়ে ডেঙ্গু এখন এমন সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা আগে তুলনামূলকভাবে কম হতো।এখন বিষয়টি কেবল ডেঙ্গুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সাধারণ ফ্লু সংক্রমণের ওপরও প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ফ্লু-এর মরসুম বা প্রাদুর্ভাবের সময়কাল আগের মতো আর সহজে অনুমান করা যাচ্ছে না।
কিন্তু এমনটা কেন ঘটছে?
এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি মশার দ্রুত বংশবৃদ্ধি করছে। মশার দল দীর্ঘায়ু হচ্ছে। সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতাও বাড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী বর্ষাকাল পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে। এদিকে, ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান বাহক এডিস মশা শহর ও গ্রাম— উভয় পরিবেশেই টিকে থাকছে ও বংশবৃদ্ধির উপযোগী হয়ে উঠেছে। এরা এখন সামান্য পরিমাণ জমে থাকা জলেও বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং দিনের বেলাতেও সক্রিয় থাকে। এর সম্মিলিত প্রভাবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমশ বাড়ছে।