কস্তুরী সেনগুপ্ত: ভারতে মাতৃপূজার ক্রমবিকাশের ধারাকে অনুসরণ করতে হলে, বেদ থেকে আরম্ভ করতে হবে। বেদই হলো ভারতীয় ধর্ম, সাহিত্য এবং সভ্যতার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন। বেদে পুরুষ দেবতারই প্রাধান্য। নারী দেবতাদের স্থান দ্বিতীয় সারিতে। অদিতি: বৈদিক যুগে নারী দেবতা হিসেবে গণ্য হবার যাঁদের সম্ভবনা ছিল, তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম নাম করা যেতে পারে দেবী অদিতির। তাঁকে অনেক ক্ষেত্রেই দেবগনের জননী (দেবমাতা) হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কখনো কখনো বিশ্বজননী বলেও বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু ভারতের ধর্মীয় ইতিহাসের কোন যুগেই অদিতি দেবীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।
পৃথিবী: পৃথ্বীদেবী হলেন একজন অতিবিশিষ্ট দেবী। মহামাতা’ বলে তাকে সম্বোধন করাও হয়েছে। তবে এটা লক্ষণীয় যে পৃথ্বী দেবীকে খুব কম ক্ষেত্রেই আলাদা করে শুধুমাত্র তাঁকে আহ্বান বা স্তুতি করা হয়েছে।’ আমাদের মাতা পৃথ্বী মহীয়সী’– এটাই ছিল বৈদিক কবিদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। প্রাণবন্ত ফসলের বৃদ্ধি, খাবার এবং ধন দানের আকাঙ্ক্ষা করে মাতা পৃথিবী বা পৃথ্বীকে আহ্বান করা হতো। মহাপাপ থেকে মুক্তির জন্য এবং সমৃদ্ধি, সুখ, সাহস, সন্তান-সন্ততি এবং দীর্ঘায়ু লাভের জন্য প্রার্থনা করা হতো তাঁর কাছে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে পৃথিবীকে শ্রী – দেবী রূপে কল্পনা করা হয়েছে। কয়েকটি উপনিষদেও কৃষি এবং ভাগ্যদেবী শ্রী এবং লক্ষ্মীর সঙ্গে একীভূত করেই ধরিত্রীকে কল্পনা করা হয়েছে। পৌরাণিক সাহিত্যে পৃথিবী বহু জায়গায় এবং বহুভাবে বর্ণিত হয়েছেন– হয় শক্তির কোন বিশেষ আকারে অথবা মহা – মাতৃকা রূপে।
সরস্বতী: ভারতবর্ষে ব্যাপকভাবে যে সকল দেবীর পূজা প্রচলিত হয়ে আসছে আজ পর্যন্ত, তাঁদের মধ্যে তিনিই হলেন অন্যতম প্রধান দেবী। ঋগ্বেদের যুগে প্রথমে তিনি ছিলেন এক প্রধান এবং পবিত্র নদী। এরপর তিনি হলেন একজন নদী- দেবতা। ঋগ্বেদে সরস্বতী নদীর স্তুতি এবং প্রার্থনা মন্ত্র গুলো পাঠ করলে মনে হয়, সরস্বতী কে বৈদিক ঋষিরা শুধুমাত্র একটি নদী বলেই মনে করতেন না। নদীর ওপরে এক সর্বনিয়ন্তা দেবী সত্তার আরোপেও তাঁদের অন্তর্নিহিত একটি বিশ্বাস প্রচ্ছন্নভাবে নিহিত ছিল। তাঁর ক্রমবিবর্তনের পরবর্তী স্তরে তাঁকে ‘বাক ‘ দেবী রূপে কল্পনা করা হয়েছে। বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে তাঁকে কোন কোন স্থলে ব্রহ্মার কন্যা রূপে ও বর্ণনা করা হয়েছে। আবার কোন ক্ষেত্রে তাঁকে ব্রহ্মার পত্নী বা শক্তিরূপে ও দেখা হয়েছে।
শ্রী: সৌন্দর্য এবং ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষী অথবা শ্রী। বোধায়নের ধর্মসূত্রেও শ্রীদেবীর পূজার উল্লেখ দেখা যায়। রামায়ণ এবং মহাভারতের কিছু শ্লোকেও তাঁর উল্লেখ আছে।
দেবী: বেদের সূক্তগুলির মধ্যে, ঋগ্বেদের দশম মন্ডল, দশম অনুবাকের ১২৫ সংখ্যক সূক্তটি যা পরবর্তীকালে দেবী- সুক্ত বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তাকে ভারতীয় শক্তি পূজার সর্বপ্রথম নিদর্শন রূপে গ্রহণ করা হয়। সমগ্র সূক্তটি হচ্ছে বাক-এর দিব্য অনুভূতিসঞ্জাত ভাবের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি। আত্মপলব্ধির মাধ্যমে তিনি পরমব্রহ্মের সঙ্গে নিজের সম্পূর্ণ একত্ব অনুভব করেছিলেন।
রাত্রি: ঋগ্বেদের দশম মন্ডলের দশম অনুবাকের অন্তর্গত ১২৭ সংখ্যক সূক্ত হল আরেকটি নিদর্শন যেখানে পরবর্তীকালে মাতৃ পূজার ভাবটি প্রকট হয়ে উঠেছে।এই সূক্তটিকে বলা হয় রাত্রি সূক্ত। এই দেবী বিশ্বকে আবৃত করে আছেন, তিনি সকল জীবকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন, তিনি স্নেহশীলা জননীর মত সকলকে শান্তিময় আশ্রয় প্রদান করেন।
অম্বিকা, উমা, দুর্গা: শুক্লযজুর্বেদে দেবী অম্বিকার উল্লেখ দেখা যায়। এখানে দেবী অম্বিকাকে রুদ্রের ভগিনীরূপে কল্পনা করা হয়েছে। এবং তাঁকে যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে রুদ্রের সঙ্গে তাঁর যজ্ঞ ভাগ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। অথর্ব বেদে আমরা এমন একটি সূক্ত পাই যেখানে মহা মাতৃদেবীর সাধারণ একটি স্তুতি বর্ণিত হয়েছে। এই সূক্তে দুটি জিনিস বিশেষ ভাবে লক্ষ্যনীয়। এক, এই মহাদেবীই হলেন বিশ্বের সকল মহিমামন্ডিত এবং শক্তি সম্পন্ন বস্তুর অন্তর্নিহিত মহিমা এবং শক্তি। দুই, তিনি সর্বশক্তিমান দেবতাদের ও অন্তর্নিহিত শক্তির আধার, সেই ইন্দ্রের ও তিনি জননী। পরবর্তীকালে আমরা এই মহাদেবীকে কেন উপনিষদে দেখতে পাই।” উমা” মহাদেবীর একটি সুপ্রসিদ্ধ নাম। এই উমা বা ভারতীয় পর্বত কন্যা দেবী পার্বতী হলেন পুরাণের বহু মাতৃদেবতার মূল মাতৃকা। বানভট্টের কাদম্বরীতেও শবরদের দ্বারা দেবী পূজার উল্লেখ আছে। খিল-হরিবংশে( মহাভারতের পরিশিষ্ট গ্রন্থ ) উল্লেখ আছে যে,দেবী দুর্গা শবর,পুলিন্দ প্রভৃতি জাতির দ্বারা পূজিতা হন। আমাদের মধ্যে যে একটা ভুল ধারণা আছে যে একই দেবীশক্তি কালক্রমে বহু দেবীতে বিভক্ত হয়েছেন — তা যথার্থ সত্য নয়।