নিজস্ব সংবাদদাতা: আপার গঙ্গা ক্যানেল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পর, ‘হর কি পৌরি’তে মজে যাওয়া নদীর তলদেশ বেরিয়ে পড়ার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে। প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এই ক্যানেল বন্ধ করার প্রক্রিয়ার ফলে নদীর তলদেশে প্রচুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা নদীটির দূষণ নিয়ে নতুন করে আশঙ্কার তৈরি করেছে। হরিদ্বারের ‘হর কি পৌরি’র দৃশ্যগুলো উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাভাবিক। কারণ গঙ্গা নদী শুকিয়ে যাওয়ার মতো ছবি দেখা যাচ্ছে যে! নদীর তলদেশের যে অংশগুলো সাধারণত জলের নিচে থাকে, সেগুলো এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তবে এই অস্বাভাবিক দৃশ্যটি সাময়িক। আসন্ন কুম্ভ মেলার প্রস্তুতি এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘আপার গঙ্গা খাল’ (Upper Ganga Canal) বন্ধ রাখা হয়েছে। যার ফলেই এমনটা ঘটেছে। গত ২০ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে খালটি বন্ধ করা হয়েছে এবং ৮ নভেম্বর পর্যন্ত এটি বন্ধ থাকবে। কুম্ভমেলার আয়োজনের আগে কর্তৃপক্ষ ঘাটের সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন নির্মাণকাজ চালাচ্ছে। হর কি পৌরিতে গঙ্গার নদীগর্ভ উন্মুক্ত হয়ে পড়া মানেই যে নদীটি শুকিয়ে যাচ্ছে তা নয়, তবে সেখানে পড়ে থাকা বর্জ্য ভারতের অন্যতম পবিত্র এই নদীর দূষণ ও স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গঙ্গার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ প্লাস্টিক। জলপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশের কিছু অংশ—বিশেষ করে ঘাটগুলোর কাছাকাছি এলাকা—উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর নদীপথ বন্ধ থাকার সময় এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে জল কমে যাওয়ার ফলে আরও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সামনে এসেছে। নদীর তীরে জমে থাকা বর্জ্যের স্তূপ। নদীর উন্মুক্ত অংশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের ব্যাগ, পলিথিন, ফেলে দেওয়া কাপড়, নারকেলের খোসা, বিভিন্ন দেব দেবীর প্রতিমা এবং আরও নানা ধরনের বর্জ্য। গঙ্গাকে পরিচ্ছন্ন রাখার চ্যালেঞ্জ খুব কঠিন। কোটি কোটি মানুষ জল, জীবিকা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য এই নদীর ওপরই নির্ভরশীল। প্লাস্টিক দূষণ গঙ্গার বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গঙ্গা নদী বিভিন্ন উৎস থেকে দূষণের শিকার হচ্ছে—যার মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত নর্দমার বর্জ্য, শিল্পকারখানার বর্জ্য, কৃষি জমি থেকে ভেসে আসা দূষক পদার্থ এবং কঠিন বর্জ্য। প্লাস্টিক এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ ফেলে দেওয়া প্যাকেজিং ও অন্যান্য প্লাস্টিক সামগ্রী পরিবেশে কয়েক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।
প্লাস্টিক বর্জ্য যখন নদীতে পড়ে, তখন তা স্রোতের টানে ভাটির দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পৌঁছায়। এই যাত্রাপথে প্লাস্টিক জলজ প্রাণীদের শরীরে জড়িয়ে যেতে পারে, অথবা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী একে খাবার ভেবে খেয়ে ফেলতে পারে। প্লাস্টিক খেয়ে ফেললে প্রাণীদের শারীরিক ক্ষতি হতে পারে, তাদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস ব্যাহত হতে পারে এবং তারা ক্ষতিকারক রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় প্লাস্টিক সামগ্রী ভেঙে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’-এ পরিণত হয়। এই অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো জলজ প্রাণীরা খেয়ে ফেলে, যা পরে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই কণাগুলো মিঠা জলের পরিবেশ এবং জলজ প্রাণীদের মধ্যে শনাক্ত করা গেছে; তবে গঙ্গার বাস্তুতন্ত্রের ওপর এগুলোর সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হতে পারে, তা এখনো গবেষণাধীন। দূষণের এই সমস্যা কেবল প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্লাস্টিক বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, নদীর প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ক্ষতি করতে পারে এবং জল পরিষ্কার রাখার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।
আপার গঙ্গা খাল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার অর্থ এই নয় যে, গঙ্গা নদী নিজেই শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে নদীর তলদেশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় সেখানে এমন সব বর্জ্য দৃশ্যমান হয়েছে, যা সাধারণত প্রবাহমান জলের নিচে ঢাকা থাকে। কুম্ভ মেলার প্রস্তুতি যখন জোরদার হচ্ছে, তখন কেবল জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করা বা ঘাটগুলোকে সুন্দর করে তোলাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়; বরং মূল চ্যালেঞ্জ হলো—নদীতে যাতে বর্জ্য প্রবেশ করতেই না পারে, তা নিশ্চিত করা। যে নদী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনধারণের অবলম্বন এবং একটি সমৃদ্ধ জলজ বাস্তুতন্ত্রের আধার, সেই গঙ্গাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হলে প্রয়োজন—দীর্ঘমেয়াদী নিকাশি বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা, বর্জ্য অপসারণ এবং দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ। আর এই প্রক্রিয়াটি ‘হর কি পৌরি’-তে জল ফিরে আসার পরেও নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে হবে।