নিজস্ব সংবাদদাতা: মহারাষ্ট্রের পুণে। ১৫ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন এলাকায় জল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার ঠিক পরপরই, এখন গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতেও আসন্ন শীত ও গ্রীষ্মকালে জল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কেন? কারণ তৈলবীজ ও ডালজাতীয় শস্যের চাষের জন্য যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সেচের জল থাকে। এছাড়া, মাটির স্বাস্থ্যের উন্নতি, সুষম সার ব্যবহার, প্রাকৃতিক কৃষি পদ্ধতি এবং জল সংরক্ষণ ও এই পরিকল্পনার মধ্যে পড়ে। অন্তত তেমনটাই বলছেন কৃষি কমিশনার সুরজ মানধারে। এই উদ্যোগটি এমন এক ভয়াবহ খরা-পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছে, যা রাজ্যের ৩৫৮টি তালুকের মধ্যে ৩০৫টিতেই ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হাজার হাজার কৃষক এখন তাঁদের ফসলের অর্ধেকেরও বেশি অংশ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “মারাঠওয়াড়া, বিদর্ভ এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।” তাঁর বক্তব্য, রবি মরসুমের জন্যও বর্তমান পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক বলে মনে হচ্ছে।

এই কারণেই এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে, যেখানেই পর্যাপ্ত জলের জোগান পাওয়া যাবে, সেখানেই যেন তাঁরা তৈলবীজ ও জোয়ার চাষ করেন। তাতে করে যদি তাঁরা তেমনভাবে ফসল ফলাতে না-ও পারেন, অন্তত তাদের গবাদি পশুর জন্য পশুখাদ্য তো পাওয়া যাবে। খরাপ্রবণ মারাঠওয়াড়া, বিদর্ভ এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রের কিছু অংশে ফসলের বৈচিত্র্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়ার ফলে বারবার ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা যেসব এলাকায় জলের প্রাপ্যতা সীমিত, সেখানে জোয়ার, বাজরা, ডালজাতীয় শস্য ও তৈলবীজ চাষের পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এসব ফসল চাষ নির্ভর করে মাটির প্রকৃতি ও বৃষ্টিপাতের ধরন এবং বাজারের চাহিদার ওপর। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ (ICAR)-এর সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে—যা ভূগর্ভস্থ জল ও ফসল চাষের পদ্ধতির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি—মহারাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে বর্তমান ফসল চাষের পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় জলের চাহিদা এবং জলের জোগানের মধ্যে অসামঞ্জস্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। ICAR এমন সব ফসল চাষের সুপারিশ করেছে, যেগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে কম জলের প্রয়োজন হয়। সেই সঙ্গে তাঁরা কার্যকর সেচ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই কৃষি পদ্ধতি গ্রহণের ওপরও জোর দিয়েছে।

মারাঠওয়াড়া ওয়াটার ফাউন্ডেশনের সভাপতি নরহরি শিবপুরে ফসল র্বাচানোর নেপথ্যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যখন পর্যাপ্ত জল পাওয়া যায়, তখন কৃষকরা আখ চাষ করেন; কারণ চিনিকলগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি ‘ফেয়ার অ্যান্ড রেমুনারেটিভ প্রাইস’ (এফআরপি) বা ন্যায্য ও লাভজনক মূল্য কাঠামোর মাধ্যমে ফসলের দাম নিশ্চিত করে। অন্যদিকে, ডাল ও শস্য জাতীয় ফসল চাষ করলে কৃষকদের যথাযথ মূল্য ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়। তাই কৃষকদের এই ধরনের ফসল চাষে আগ্রহী করে তোলা বেশ কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।” বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিয়েছেন যে, কেবল সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এই কাজ সফল হতে পারে না। তাঁদের মতে, কৃষকদের প্রচলিত ফসল থেকে সরে আসতে হলে নির্ভরযোগ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা, বাজারে অবারিত প্রবেশাধিকার এবং আর্থিক অনুপ্রেরণা প্রয়োজন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আসন্ন ‘খেত বাঁচাও অভিযান’-এর আওতায় ধান কাটার পরবর্তী সময়ে পতিত জমিতে চাষাবাদের কার্যকর ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা, ‘প্রতি ফোঁটায় অধিক ফসল’ (পার ড্রপ মোর ক্রপ) ধারণার অধীনে ক্ষুদ্র সেচ পদ্ধতির প্রচার চালানো হবে।

Translate »