বন্যার জল আর সেই জলের তোড়ে মালদার ভুতনির চর তলিয়ে যেতে চলেছে। ভুতনিতে বন্যা নতুন কিছু নয় ঠিকই। কিন্তু এবার যা ঘটেছে, তা কিন্তু অন্যবারে প্রতিবারে ঘটে না। কয়েকশো মানুষ কার্যত বন্দিদশায় রয়েছে এক স্কুলবাড়িতে। সেই স্কুলবাড়ির একতলার প্রায় অনেকটাই জলে ডুবে রয়েছে। চিঁড়ে-মুড়ি, একবেলা ভাত বা খিচুরি, প্রশাসন বন্দোবস্ত করেছে। রাজনৈতিক দলের জনপ্রতিনিধিরাও সক্রিয় হয়েছেন। কিন্তু তবু, ত্রাণের জন্য হাহাকার কমছে কই! দূরে কোথাও দেখা যাচ্ছে, ত্রাণ নিয়ে আসছে বড় নৌকা। অমনি ডিঙি নৌকো করে সেদিকে রওনা দিচ্ছে কমবয়সী ছেলের দল। তারপর, গলা অবধি জলে ডুবে ত্রাণবাহী নৌকো থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করছে তারা।
প্রশ্ন হল, ভুতনি-সহ মালদার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই বছর-বছর বন্যা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না কেন?
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মালদা নয়, মুর্শিদাবাদেও একই অবস্থা। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোনও পথ আজ আর অবশিষ্ট নেই বললেই চলে। তার কারণ, গঙ্গা তার যাত্রাপথ বদলেছে। বিপুল পরিমাণ পলি পড়েছে নদীখাতে। তাই নদীর বহমানতা কমেছে। কোথাও-বা নদী বাধা পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, নদীও খামখেয়ালি হয়ে উঠে যেখানে বাঁক নিচ্ছে, সেখানকার ঘরবাড়ি থেকে শুরু স্কুলবাড়ি পর্যন্ত তলিয়ে যাচ্ছে জলে। শুধু ঘরবাড়ি নয়, গঙ্গা ও পদ্মার ভাঙনে মালদা ও মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একের-পর-এক স্কুলবাড়ি পর্যন্ত তলিয়ে যাচ্ছে। কোথাও-কোথাও বোল্ডার দিয়ে নদীভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা চলছিল ঠিকই। তবে তা খুব-একটা কার্যকরী নয়। তাই, স্কুলবাড়ি থেকে বসতবাড়ি গ্রাস করছে নদী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীখাতে বিপুল পরিমাণ পলি জমা হওয়া আর নদীর বাঁক পরিবর্তনের জন্য ফরাক্কা ব্যারেজ অনেকটাই দায়ী। ব্যারেজের কারণে যে-বিপুল পরিমাণ পলি পড়ছে নদীখাতে, তা তুলে নিয়ে স্থলভাগে ফেলতে হলে বিস্তীর্ণ জনপদ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এতই পলি পড়েছে সেখানে! নদীখাত থেকে পলি তোলা, বন্যা প্রতিরোধে সামগ্রিকভাবে পরিকল্পনা করার দায়িত্ব কার, তা নিয়েই একে অন্যের দিকে দায় ঠেলছে। ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, সেচ দফতর, কে যে কী ব্যবস্থা নেবে, তা বোঝা ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। নদী বিশেষজ্ঞরা কেউ কেউ বলছেন, ফরাক্কা ব্যারেজ তৈরির সময়ে কেউ কেউ কিন্তু সতর্ক করেছিলেন। বলেছিলেন, এই ব্যারেজ এক জায়গা বাঁচাতে গিয়ে অন্য জায়গায় বিপদ ডেকে আনতে পারে। কিন্তু তখন তাদের কথায় কর্ণপাত করা হয়নি। এমনকি, ব্যারেজের সৌজন্যে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ পলিজমা হচ্ছে জেনেও কোনও কর্তৃপক্ষই সেভাবে গা-করেনি। তাই, ব্যারেজ সংলগ্ন মুর্শিদাবাদ ও মালদার দুর্দশাও রোখা যায়নি।