নিজস্ব সংবাদদাতা: স্কুবা ড্রাইভিং -এর দৌলতে সমুদ্রের অন্দরে আজ সহজেই ঢুকে পড়েছি আমরা। জীবজগতের নানান বৈচিত্র নিয়ে প্রকৃতি তৈরি করেছে সামুদ্রিক সংসার। নিজের চোখে তা দেখলে মনে হয় যেন রূপকথার দেশে চলে এসেছি। বিভিন্ন রঙিন মাছ, বিভিন্ন জলচর জীববৈচিত্র্যে পূর্ণ সমুদ্রের গভীর অংশ। আর হ্যাঁ, আছে প্রবাল। প্রকৃতি সমুদ্রকে ভালোবেসে উপহার দিয়েছে প্রবাল নামক প্রাণী। বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় এদের ভূমিকা যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বলাই বাহুল্য।

জেলিফিশ ও সাগরকুসুমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় প্রবাল অ্যান্থজোয়া শ্রেণীর প্রাণী। প্রবালের দেহ খুব নরম। এই নরম দেহের একক অংশ হল ‘ পলিপ ‘। নিজেদের রক্ষা করতে এরা শরীরের চারপাশে শক্ত খোলস তৈরি করে। ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা চুনাপাথর নিঃসরণ করে নিজেই তা দিয়ে তৈরি করে এই শক্ত আবরণ। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই এ হেন কৌশল। খোলসগুলো দেখতে পাথরের মতন হয়। সালোকসংশ্লেষে সক্ষম জুক্সানথেলা নামক শৈবালের সঙ্গে এর বন্ধুত্ব বেশি।এই কারণেই দুজনের সহাবস্থান। আসলে শৈবালগুলো সূর্যের আলো ব্যবহার করে প্রবালের বর্জ্যপদার্থকে শর্করা ও প্রোটিনে রূপান্তরিত করে, যা থেকে প্রবাল নিজের খাবার ও শক্তি সংগ্রহ করে।

বছরের পর বছর বেঁচে থাকে প্রবাল। বংশবৃদ্ধি করার কাজটিও সম্পূর্ণ করে নির্দিষ্ট সময়ে। যখন প্রাণীটি মারা যায় তখন তাদের তৈরি করা শক্ত খোলসগুলো থেকে যায়। এই শক্ত খোলসগুলোর ওপরেই আবার নতুন প্রবাল জন্মায়। এভাবেই ধীরে ধীরে বিশাল প্রবাল প্রাচীর গড়ে ওঠে। বাস্তুতন্ত্রে বা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রবাল প্রাচীরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রবাল প্রাচীর প্রায় ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক প্রজাতির জীবনধারণে সাহায্য করে। লক্ষ লক্ষ সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ, জেলিফিশের প্রধান বাসস্থান, প্রজনন ক্ষেত্র, নিরাপদ আশ্রয় এই প্রবাল প্রাচীর।

প্রবাল প্রাচীর বাঁধের মতো কাজ করে সামুদ্রিক ঝড়, সুনামি থেকে উপকূলভাগকে রক্ষা করে। এছাড়া, অন্যান্য সামুদ্রিক উদ্ভিদের খাবার তৈরিতে এই প্রবাল প্রাচীর কাজ করে যাতে করে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল সচল থাকে। শুধু এই নয়, সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ক্যালসিয়াম কার্বনেট- এর খোলস তৈরি করে, যার ফলে সমুদ্রের অম্লতা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই প্রবাল প্রাচীর আজ বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সামুদ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কার্বন-ডাই- অক্সাইড গ্রহণের ফলে সাগরের অম্লক্ষরণ এর জন্য দায়ী। এবং অবশ্যই দায়ী আমরা। জলদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, উপকূলে অবাধ নির্মাণ, সমুদ্রের তলদেশ খনন, অসতর্ক পর্যটনের কারণে প্রবালের কাঠামোগুলো আজ ভেঙ্গে যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বাস্তুতন্ত্রে।

আর কত ক্ষতি করব আমরা!

Translate »