নিজস্ব সংবাদদাতা: সে এক সময় ছিল। লক্ষ্মীর কাছে মানুষ চাইত গোলা ভরতি ধান। লক্ষ্মীও গোলা ভরে ধান দিত। আমাদের মতো কৃষিপ্রধান দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তো বছরভর গোলা ভরতি ফসল। আর কী চাই। ভাত-কাপড়ের ভাবনা দূর হলে আর কী চাই। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতে গাঁয়ের বধূ তখন আগের রাতে ভিজিয়ে রাখা চাল বেটে আলপনা দিত। লক্ষ্মীর পদচিহ্ন যেন জীবন্ত হয়ে উঠত সেই আলপনায়। আর সেই জীবন্ত পদচিহ্ন ধরে লক্ষ্মী আসত ঘরে। হিন্দু পুরাণ বা শাস্ত্রমতে লক্ষ্মী সৌভাগ্য, সমৃদ্ধি, সৌন্দর্য এবং ঐশ্বর্যের দেবী। দিন বদলাল। নবান্নের সময়ে অঘ্রাণের আঘ্রান আর পেলাম না আমরা। দশহাজার বছরের কৃষি-নির্ভর সভ্যতা যন্ত্র-সভ্যতার মুখোমুখি হল। আর সেই সঙ্গে যন্ত্র গ্রাস করতে শুরু করল আমাদের প্রকৃতি। আমাদের পায়ের তলা থেকে মাটি হারিয়ে গেল। মাটির প্রতিমাও তাই মুখ ফিরিয়ে নিল আমাদের থেকে। প্রথমে যন্ত্রযুগ আর পরে দূষণ-যুগে প্রবেশ করলাম আমরা। আমাদের লক্ষ্মীশ্রী বেঁচে থাকা লক্ষ্মীছাড়া হয়ে উঠল।

নৃতত্ত্ববিদ থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞানী, সবাই বলেন, আমাদের ধানচাষের সঙ্গে লক্ষ্মীর আরাধনা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। প্রথমে হলকর্ষণ, জমি তৈরি, তারপর ধান রোয়া, বীজতলা তৈরি, তারপর একটা সময়ে ধান পাকলে সেই ধান কেটে ঘরে তোলা। সামগ্রিকভাবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর সম্পর্ক রয়েছে। লক্ষ্মীর আরাধনা করলে তবেই তো গোলা ভরতি ফসল আসবে ঘরে। এখন লক্ষ্মীর সঙ্গে আমরা দূষণ নামক অলক্ষ্মীকে ঘরে ঘরে ডেকে আনলাম। পণ্যকে ঘিরে আমাদের লোভ-লালসা বাড়তে থাকল। বাড়তেই থাকল। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনের জিনি অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠল আমাদের কাছে। নিত্যনতুন পণ্যের সম্ভারে চোখ ধাঁধিয়ে গেল আমাদের। কোজগরী বা রাত জেগে লক্ষ্মীর আরাধনা করলাম বটে, তবে তার চেয়ে অনেক বেশি আরাধনা করলাম পণ্য-দৈত্যকে। আর, সবকিছুই চাইলাম বেশি-বেশি করে। জমিতে আমরা রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে শুরু করলাম। সেইসঙ্গে রাসায়নিক কীটনাশকও। সেই কীটনাশক আবার ফসলের মধ্যে দিয়ে আমাদের দেহে প্রবেশ করল। সেই জমির ঘাস খেয়ে গবাদি পশুর দেহে ঢুকে পড়ল রাসায়নিক বিষ। গরুর দুধের মাধ্যমে তা আমাদের শরীরে ঢুকে পড়ল।

শুধু কি তাই। গোলা ভরতি ধানের চেয়ে আমার বেছে নিলাম বিলাসবহুল জীবন। আমাদের সেই বিলাসের জোগান দিতে এমন সব কাজকর্ম শুরু হল, যা পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে দিল। বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকল। গলতে থাকল বরফ। গলতে থাকল হিমবাহ। ধেয়ে এল হড়পা বান। ভাসিয়ে নিয়ে গেল জমিজমা। অন্যদিকে, চাষের জমিতে গড়ে উঠল স্যাটেলাইট টাউনশিপ। অন্যদিকে, শাওয়ার বাথ থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক কলের নিচে হাত রাখতেই জল প্রবাহিত হল বটে। তবে আমাদের অফুরান জলের জোগান দিতে-দিতে মাটির তলায় জলের স্তর তলানিতে গিয়ে ঠেকল। তবু, ‘এসো মা লক্ষ্মী বসো ঘরে’।

Translate »