নিজস্ব সংবাদদাতা: গঙ্গা নদীর ডলফিন (Platanista gangetica) হলো ভারতের মিষ্টি জলের ডলফিন প্রজাতির অন্যতম। এরা বিচরণ করে বেড়ায় গঙ্গা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকা জুড়ে। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর ‘ন্যাশনাল গঙ্গা রিভার বেসিন অথরিটি’ (NGRBA)-র এক বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং গঙ্গার এই ডলফিনকে ‘জাতীয় জলজ প্রাণী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০১০ সালে ভারত সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দেয়। তারপর এই ডলফিনদের সংরক্ষণ আরও জোরদার হয়। সর্বশেষ (২০২১–২০২৩) তথ্য অনুযায়ী, দেশে গঙ্গা নদীর ডলফিনের সংখ্যা আনুমানিক ৬,৩২৪টি।

গঙ্গা নদীর ডলফিনের আবাস কিন্তু সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা কোনও সংরক্ষিত এলাকার বাইরে। তাই, মাছ ধরার জালে আটকা পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বিস্তর। তাছাড়া, জলদূষণ বা আরও অনেক ঝুঁকি নিয়ে জলের তলায় ঘর বাঁধতে হয় তাকে। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি ও রূপনারায়ণ নদী অববাহিকায় একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে; এখানে নদী সংলগ্ন অঞ্চলে ডলফিনের সুস্থ ও সক্রিয় বিচরণ সুনিশ্চিত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এখানে মৎস্যজীবীরা কিন্তু মাছ ধরেই নিজেদের গ্রাসাচ্ছদন করে। এখানকার জেলেরা মাছ ধরার জন্য মনোফিলামেন্ট গিলনেট (এক ধরনের জাল) ব্যবহার করেন। যা ইলিশ মাছ ধরতে অব্যর্থ। এই বিশেষ ধরনের জাল শব্দতরঙ্গের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ (acoustically transparent) বা শব্দ-প্রতিফলনহীন হয়ে থাকে। গঙ্গা নদীর ডলফিন দৃষ্টিশক্তিহীন; তারা এই আল্ট্রাসনিক শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে শিকারীর অবস্থান শনাক্ত করে। অন্য মাছ এই জালগুলোকে শনাক্ত করতে পারে না, যার ফলে তারা জালে আটকা পড়ে যায়। কিন্তু ডলফিন এই জালের ধারের পাশ দিয়েও যায় না।

বলে রাখা ভালো, সহজেই নিজেদের খাবার জোগাড় করার প্রলোভন থেকে মূলত দুটি পরিস্থিতির উদ্ভব হয়— হয় ডলফিনগুলো সফলভাবে মাছ নিয়ে পালিয়ে যায় (যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘটে), অথবা তারা নিজেরাই জালে জড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন জেলেরা প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ ধরতে পারেন না, অন্যদিকে জাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার, ওই জালে ডলফিনের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এই সমস্যার সমাধানে, ডব্লিউডব্লিউএফ-ইন্ডিয়া (WWF-India) এবং তাদের সহযোগীরা ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ‘পিঙ্গার’ (pinger)-এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেছে। পিঙ্গার হলো ডলফিনকে দূরে রাখার এক ধরণের শব্দ-নির্গতকারী যন্ত্র (acoustic exclusion device), যা সরাসরি মাছ ধরার জালের সাথে যুক্ত করা হয়। এটি গিলনেট ব্যবহারের সময় লক্ষ্যবহির্ভূতভাবে ডলফিন ধরা পড়ার (bycatch) হার কমাতে পারে। পিঙ্গার ৫০-১২০ কিলোহার্টজ (kHz) কম্পাঙ্কের শব্দ-সংকেত বা ‘পিং’ নির্গত করে; ডলফিন এই শব্দ শুনতে পায় এবং এর ফলে তারা মাছ ধরার জালের কাছাকাছি আসা থেকে বিরত থাকে।

Translate »