নিজস্ব সংবাদদাতা: মরুভূমি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধু-ধু বালির প্রান্তর। কোথাও আর কিছু নেই। মনে হয়, আকাশের সীমান্ত রেখা যেন মিশেছে বালির প্রান্তরের শেষ সীমানায়। প্রাণের স্পন্দন বলতে রয়েছে ক্যাকটাসজাতীয় বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় গাছ। আসলে এখানকার জীব বৈচিত্র্য ভারি অদ্ভুত— ক্যাকটাস আর উট। আর মরুভূমির প্রসঙ্গ এলেই, মনের আয়নায় অবশ্যই ভেসে ওঠে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘সোনার কেল্লা’। মনে পড়ে জটায়ুজির সেই আইকনিক প্রশ্ন, “উট কি কাঁটা বেছে খায়”?
শুষ্ক মরুভূমি ছাড়াও পাওয়া যায় আর এক ধরনের মরভূমি, যা বরফে আবৃত— মেরু মরুভূমি। কিন্তু এখানে আমরা বলছি, সাদা মরুভূমির কথা। যা রয়েছে আমাদের দেশেই। সাদা বরফের পাহাড় না-থাকলেও এর জমির রং ধবধবে সাদা। সমুদ্র না-থাকলেও মাঝেমাঝে জলধারা প্রবাহিত হয় এই সাদা মরুভূমিতে। আসলে, আমরা বলছি, কচ্ছ উপকূলের রণ-এর কথা। হিন্দি ‘রণ’ শব্দটির অর্থ, মরুভূমি। আর ‘কচ্ছ’ কথাটি এসেছে স্থানীয় লোককথা থেকে। বলা হয় যে, এই অঞ্চলের মানচিত্র উল্টো করে ধরলে তা কচ্ছ অর্থাৎ কচ্ছপের মতো দেখায়। রণের দুটো অংশ। বৃহৎ রণ, ছোট রণ। প্রায় ৭ হাজার বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বৃহৎ রণ। লক্ষ-লক্ষ বছর আগে এই অঞ্চলটি ছিল আরব সাগরের একটি খাড়ি অংশ। পরবর্তী সময়ে মাটির অভ্যন্তরে টেকটনিক প্লেটের চলাচল এবং ক্রমাগত ভূমিকম্পের কারণে, এই অঞ্চলের উচ্চতার পরিবর্তন হয়। যার ফলে সমুদ্রের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
জল নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গিয়ে, বিরাট অববাহিকা সৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে এখানে বৃষ্টির জল জমা হয়। রাজস্থানের লুনি, ভুলি— এইরকম বেশ কিছু নদী প্রবাহিত হয় ওই অঞ্চল দিয়ে। কিন্তু, গ্রীষ্মকালে তীব্র রোদের দহনে, এই জল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। লবণ শুধু থেকে যায় রণের জমিতেই। কত শত বছর ধরে এই বর্ষা ও বাষ্পীভবনের চক্র চলতে থাকায় মাটির উপরের ভাগে স্তরে-স্তরে পুরু লবণের আস্তরণ জমতে-জমতে তৈরি হয়েছে এই সাদা মরুভূমি। জীব বৈচিত্র্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধ কচ্ছের রণ। চরম লবণাক্ত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, এমন কিছু লোনা মাটির উদ্ভিত এখানে জন্মায়। হাজার-হাজার ফ্লেমিংগো পাখির সমাগম হয় বৃহৎ রণ অঞ্চলে। কচ্ছের রণে দুশোর বেশি প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এবং ওখানকার স্থানীয় পাখি দেখতে পাওয়া যায়। ছোট-রণ অঞ্চলের বিপন্ন প্রাণী হল বন্য গাধা। এছাড়াও কালো হরিণ, বনবিড়াল, নীলগাই, এইসব প্রাণীর বসবাস এখানেই। কাটা লেজওয়ালা টিকটিকি-সহ, বিভিন্ন প্রজাতির সরীসৃপও মিলেমিশে থাকে এই অঞ্চলে। এ-দেশের ৮০ শতাংশ লবণ আসে এই কচ্ছের রণ থেকেই। আমার আপনার ঘরে কচ্ছের সেই লবণ এসে পৌঁছচ্ছে কি না, তা অবশ্য বলা মুশকিল।